চিরকালের খেলাঘর...
এ পৃথিবীতে বোধহয় চিরকাল কোনো বস্তু তার অস্তিত্ব ধরে রাখে না, ঠিক তেমনি ব্যক্তিমানুষও একটা সময় কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যায় ; জন্ম যেমনখুব স্বাভাবিক নিত্যদিনের জন্য, মরনেও তার প্রকৃতির সেই অমোঘ বাণীর প্রতিফলন- এ জীবনের ছবি হয়তো সমুদ্রের কোন একটা ঢেউ-কল্লোল, ধূ ধূ জলরাশির গভীরে যার শুরু, দূরে বহুদূরে একসময় তার মিলিয়ে যাওয়া।
আজকে যে গল্পটি লিখতে চলেছি, সেটা নিছকই আমার মনের এক দৈব ভাবনা, যখন তপ্ত দুপুরের জলাহার শেষে সবাই ভাতঘুমের ঘোরে তন্দ্রামগ্ন, বাড়ির মেঝেতে নিশ্চিন্তে নিরালায় ঝিমোনো বিড়ালটাও যেন ধুঁকছে বাইরের রোদ থেকে কিছুটা তফাতে, আর আমার কাতলা মাছের কাঁটাটা পেটে চালান করে দিয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুরে চোখ বুঝছে, ঠিক সে সময় আমি ভাবছি তাবৎ বিশ্বসংসার আর এ পৃথিবী নিয়ে, কে থাকে পড়ে আর কে হারিয়ে যায় -তার গুনগত ফিরিস্তি নিয়ে।

Source
শুরুতে সমুদ্রের ঢেউটাকে এ মানুষ হিসেবে জীবনের পটভূমিকায় তুলে ধরলাম একটা কারনে, যেন খুব সহজে নিছকই সামান্য গল্পটার খুব ভেতরে চলে যাওয়া যায়, নিরিবিলি ঐ মন্দিরে বসে যে ধ্যানমগ্ন হয়ে বসে আছে তার মনের গভীরে, নয়তো এক মনে জিকির করা সে যুবক যে সারা সকাল শুধু এক আল্লাহর প্রার্থনায় সমাগত,সুকণ্ঠ ধ্বনিতে মশগুল তার বর্ণনায়।আশা করি,শেষটায় একটা কিনারায় পৌঁছাতে পারবো, ধন্যবাদ।
পাখপাখালির আনাগোনায় মুখরিত,ফুলেফলে সুশোভিত, সবুজের শ্যামলীমায় ছায়াঘেরা প্রান্তর,গগনের হালকা মেঘে ঢাকা মাঠ, তারই পাশে বয়ে যাওয়া একটা রুপসা নদী ; হালকা জোয়ারে যেখানে খেলছে চুনোপুঁটি মাছের দল, আহা! কি সুন্দর সে প্রানের রুপ, ছলাত ছলাত শব্দে বয়ে যাওয়া নদী তার নৌকোর দিকে চেয়ে আছে,উদাস বালক দুচোখ দিয়ে তাকিয়ে বিলের গাছের জামবাগানে,কৃষাণ দম্পতি হলুদ রাঙা ফসলের দিকে চকচকে চোখে তাকিয়ে - আর এসবের মাঝে দাঁড়িয়ে একটি বসতি ঘেরা গ্রাম- যার মধ্য দিয়ে মেঠোপথ আর কাঁচাকাদার রাস্তা বাইরের দিকে ছুটলো।
সে গ্রামটি চোখে ভাসছে নিশ্চয়ই, কিন্তু আরো ভেতরে যেতে হবে কারন গল্পটার অন্তরে যে দুজন হাতছানি দিচ্ছে। দুটি পাশাপাশি পরিবার, ঠিক যেন পার্শ্ববর্তী দুটি প্রতিবেশী অম্লান বদনে একে অপরের সাথে বাক্যব্যায়,হাসিঠাট্টা, গৃহীণীতে বউয়ে সুগভীর ভাব, তাদের দুটি শিশু আর দুষ্টামির রাজ্যে দুই অভিনেতা যারা শুধু ঘুরে বেড়ায় আপনমনে,সকাল বেলার রাঙা ভোরে যার শুরু, সন্ধ্যার গোধূলিতে যার ঘরে ফেরা- যেদুটি ফুল যেন একটি বাগানের দুটি টগবগে গোলাপ, রূপে সৌন্দর্যে ঐশ্বর্যে সবার সেরা ; ঠিক তেমনি দীপু ও মাধুরি, যেন একই ফুলের দুটি পুষ্পমঞ্জরি।

Source
দুজনের ছেলেবেলাটির ক্ষেত্রে সবচেয়ে যেটি মনে দাগ কাটে তা হলো, তারা কখনোই একরাশ শৈশবের চপলতায় ডুবে থেকে খেলাঘর বাঁধে নি, বরং যেমন কোনো কবির লিখে যাওয়া একটি ছন্দহীন কবিতা একসময় কোনো আনকোরা সুরকারের ঠোঁটের পরশে একসময় সুরেলা গানের কলিতে পরিণত হয়,একসময় সুৃমধুর সঙ্গীতের গীতে মুখর হয়ে উঠে,গানের রেশ ফুরোয় ঠিক তা সত্ত্বেও তার ধুয়া মনে থেকে যায় আরও কিছুকাল ;এ হলো ঠিক তেমনি তাদের ছেলেবেলাটার কাহিনী।
পাড়ার পন্ডিতমশাইয়ের টোলে পড়তে যাওয়া, চক স্লেট হাতে কাঁধব্যাগ; অন্যহাতে একরাশ বরইফল লবন, দুটো শিশু গল্প করতে করতে যাচ্ছে, মাঝেমাঝে খুনসুটিতে জড়িয়ে যাওয়া, পথে চলতে চলতে একসময় স্কুলের চৌহদ্দিতে এসে মাস্টারমশাইয়ের পড়া গুছানো আবার দুপুরের শুরুতে রোদ-ছায়ার মাঝখান দিয়ে ঘরে ফেরা, নাওয়া খাওয়ার পালা শেষে বিকেলের পুকুরপাড়ে মাছেদের সাথে ছিপ হাতে বসে পড়া, কিংবা গোল্লাছুটের মহড়ায় মেতে ওঠা, কখনো ভরা সন্ধ্যায় কানামাছি ভো ভো বা দাদার কাছে গল্পের আসরের আবদার - এ সোনালী শৈশবের দৃশ্য যারা ফেলে এসেছেন, তারা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন দিনগুলো কেমন ছিল।
দিন যায়, মাস যায়, বছর পেরিয়ে নতুন বৈশাখের উষ্মদিন চলে আসে। সময় কীভাবে কেটে যায়, বোধহয় প্রকৃতিও বুঝতে পারে না৷ দীর্ঘ পথের শেষে এসে যখন দীপুর গ্রাম ছেড়ে শহরের দিকে পাড়ি জমানোর সময় হলো, তখন হঠাৎ করে ওর মনে হলো, সে অনেক বড় হয়ে গেছে। তার আর আগের মতো মন টানে না, যেমনটি সে সারাবেলা ছুটোছুটি করে কাটাত, কখনো রোদে মাখানো গ্রীষ্মের দুপুরে, কিংবা বর্ষার দিনে গুমোট মনে কদম ফুলের গায়ে লেগে থাকা বৃষ্টির ফোঁটা দেখে, আমপাতা দিয়ে রেলগাড়ি বানানো - এখন এসব কিছু আর তার মনে ধরে না।

Source
একদিকে দীপুর পরিবার শহরে চলে এসেছে, তার বাবা নতুন একটি ব্যবসা ধরেছে আর দীপুর জন্য নতুন কলেজ অপেক্ষা করছে। সে জানে না তার সামনের জীবনে আরো কত চড়াই-উতরাই রয়েছে,কঠিন জীবনের বাস্তবতায় সে প্রবেশ করেছে। একদিকে সামনের দিনগুলোর ভবিষ্যৎ তাকে ডাকছে,অন্যদিকে ফেলে আসা গ্রাম,সোনালী অতীত, তার মনের সেই মাধুরী, যে ছেলেবেলা থেকে তার সাথে ছিল,কত কথা, কত স্মৃতি, কত রাগ-অভিমান,হৃদয়টান ; সে যে তার মনের গভীরে পুষে রাখা পাখি, প্রানের সখা ;তাকে ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে বহুদূরে।
এ পৃথিবীর নিয়মটা হলো এই যে,কারো জীবনের প্রয়োজন অন্য কারো জন্য থেমে থাকে না, যাকে যেতে হয় -- সে একদিন চলে যায়, ততটা দূরে,যতটা গেলে চোখের বাহিরে, অন্তরের কাছে, হৃদয়ের পাশে থেকে যায়। মাধুরী হয়তো বিদায়বেলায় কিছু বলে নি মুখে,কিন্তু তার দুটো চোখ বলছিলো কথা, সে কি খুব সহজে বোঝা যায়।
কারো মন যখন কাউকে ধরে বেঁধে রাখতে চায়, সে কি কম যাতনায় পুষে রাখা যায়?
এমনি করে দুজনের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হলো। তারপর আমি আর খবর রাখি নি। হয়তো কিছুদিন পর, মাধুরীর মা বুঝলো, মেয়েটির বিয়ে দেয়ার সময় হয়ে গেছে, তাকে এবার বরের বাড়ি পাঠাতে হবে। তারপর ধুমধাম করে বিয়ের আয়োজন সারা হলো,জমকালো আলোকসজ্জা পড়লো, বিয়ের করুন সানাই বাজলো, দীপুর মাধুরি, সেই ছোট্টটি যখনসে তার ছোট কপালে একটি লাল টিপ পরিয়ে দিত, আজো সেরকম টিপ পরা আছে, আজো মাধুরি কখনো লাল শাড়ি পরে, সবকিছু একইরকম আছে। শুধু, পার্থক্য এই, তখন ওর চোখে জল ছিল না, আজ এই বিয়ের লগ্নে আছে।

Source
বিদয়বেলাটি কেমন হলো, তা আমার বর্ণনার সাধ্য নেই, শুধু এতটুকু বলি, দীপুর হৃদয়টা বোধহয় ফাটছিল, সে জানে নি তার মাধুরির বিয়ে হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তার অন্তরে বার্তা এসেছিল৷ হয়তো কিছুদিন দীপু কিছুই খায়নি, কারো সাথে কথা বলে নি,একবার দেখতে পারে নি, ফুলের সজ্জায় মাধুরীকে কেমন লাগে নি, কিন্তু জীবন সামনে চলে গেল, ছেলেবেলার সব চিহ্ন মুছে গেল, এভাবে গল্পের রেখাও মিলিয়ে গেল, তাই নয় কি?
কিছু স্মৃতি ত থেকে যায়, ভুলার শত চেষ্টার পরও ত মনের কোনো এক ক্ষুদ্র স্থানে থেকে যায় অজান্তেই নিভৃতে, যেখানে ভুলার শত চেষ্টা বৃথা হয়ে দাঁড়ায়। সময়ের সাথে সাথে সবই প্রশমিত হয়, কিন্তু হঠাৎ যখন তার সাথে দীপুর দেখা হবে, ক্ষণিকের জন্য হলেও স্মৃতিগুলোর পুনরাবৃত্তি ঘটবে, তাই নয় কি?!
বেশ ভালো লিখেছেন ভাই🤍
হুম, তা তো অবশ্যই। আসলে মানুষ তো সবসময় একই জীবনের পাতায় থেমে থাকে না, আমরা অতীতকে পেছনে ফেলার সাথে সাথে কিছু মুহূর্তকেও রেখে আসি,দীপুর ক্ষেত্রে তার গল্পেও একটা অতৃপ্ত অতীত সে হারিয়ে এসেছে,যদি কখনো আবার তাদের দুজনের দেখা হয়, সে দৃশ্য কেমন হবে তা এখন বলতে পারছি না, তবে স্মৃতিগুলো অবশ্যই মনে জেগে উঠবে।
মানুষ যা ভুলতে চায়,তা ই বেশি করে মনে দাগ কাটে, হয়তো একদিন আপনা আপনি দীপু ব্যস্ত হয়ে পড়বে তার নিত্যদিনের কাজে, নতুন স্মৃতি এসে পুরনোটা ঢেকে দিবে। এই যা।
ধন্যবাদ ভাই, 💝।আপনি খুব প্রাসঙ্গিক একটি কথা তুলে ধরলেন।, 👍
এটা একদম সত্য। আপনাকেও অসংখ্য ধন্যবাদ আরেকটি ভালো লেখা পড়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য।
মনে হচ্ছিল মনের কথাগুলো এই গল্পের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন। আমাদের পৃথিবীতে কোন কিছুই স্থায়ী নয়। কিন্তু আমাদের অতীত আর আমাদের স্মৃতিগুলো নিজের মনের মধ্যে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত স্থায়ী হয়ে থাকে।
মানুষ খুব সহজেই দূরত্ব তৈরি করতে পারে। একটা মানুষের জীবনে প্রবেশ করতে অনেকটা সময় লাগে কিন্তু এর মধ্যে দূরত্ব তৈরি হতে একদিনের বেশি সময় লাগে না। আমি মনে করি যে মানুষগুলো চলে যায় সেই মানুষগুলোর জন্য জীবন থামিয়ে রাখা ঠিক নয়।
মানুষ জীবনকে যদিও থামিয়ে রাখতে চায় নিজের জন্য, কিন্তু জীবন কিন্তু কিছুতেই থেমে থাকে না, সে সদা সামনের দিকে এগিয়ে যায়। কেউ যদি জীবন থেকে হারিয়ে যায়, তাহলে তাকে ধরে রাখা যায় না, উচিতও না আমি মনে করি।
ভালোবাসলে পেতে হবে, এমন কোনো কথা নেই,আর কাউকে ভালোবাসলে তার প্রতিদান কিছু চাইতে নেই।
তাই, এই গল্পের দীপুর জন্য আমি আফসোস করি না, কিছুটা সমবেদনা জানাই।
জেনে খুশি হলাম যে আপনার মনের কথায়ও এই গল্পের কিছু অংশ আছে,কৃতজ্ঞ, 💝👍