তালপাতার সুখ।

avatar

ভোরবেলার সূর্য যখন দিগন্তের কিনারে এসে মাথা তোলে, কিরণদীপ্ত আলোচ্ছটা যেটা নিয়ে আসে রাঙা প্রভাত, প্রকৃতি জাগিয়ে তোলা, বেলা হয়ে এলো যে - এবার তোর ঘুম ভেঙে উঠবার পালা, সংসারের নিত্যকাজে ব্যস্ত হয়ে ছুটতে হবে, বেঁচে থাকার তাগিদে। ঠিক তার শুরুর প্রহরে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা কফির মগে চুমুক দিয়ে জানালার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে কাকপক্ষীর উড়ে যাওয়া দেখা, কি সুললিত ছবি,কত নিগূড় অনাবিল তার আহ্বান, দিনের সারিতে এগিয়ে চলো।

Source

আমাদের সবারই দিনের শুরুটা ঠিক এইভাবে,যখন সকাল বেলার লালচে আলো মিঠে সুরে ভেসে যায়,নরম আঁচে যেন এক সঞ্জীবনী ছোঁয়া লাগে, শহর কিংবা নগর, হরেক রকম প্রকৃতির শোভায়, গহীন অরন্য থেকে একরাশ ফুলের সুঘ্রান তটরেখার সীমানা ঘেঁষে ঐ ব্যক্তিটির সারা ইন্দ্রীয়জুড়ে ছুঁয়ে যায়। সারা শহরজুড়ে কত ব্যস্ততা, যার যার কর্মস্থল ডাকছে, জীবিকার তাগিদে ছুটে চলা, মাইলের পর মাইল, কারো ৯টা ৫টা অফিস তো, কেউ নিজের ব্যবসা প্রসারে নিয়োজিত হয়ে রয়েছে পড়ে৷ এসব দিনের ছুটোছুটি আর তার ভীড়ে মিলিয়ে যাওয়া - এভাবেই দিবসের গল্প, সবগুলো প্রাণের নগরে।

তবে, আমাদের সবারই দিনের শুরুটা এক ঘোরের মধ্য দিয়ে কেটে যায়, আবার তেমনি করে দুপুরবেলাটার কোলাহলে হাঁফ ছাড়া একরাশ স্তব্ধ দিন উঁকি দেয়, ক্লান্ত শরীর আর শ্রান্ত মনের কিনারা জুড়ে শুধু এক বিশ্রামের সময় খুঁজে বেড়ায়, তপ্ত দুপুর গড়িয়ে সূর্যের কাত হয়ে ঢলে পড়া, সে ও ক্লান্ত, এখানেও ক্লান্তি,জ্বলে জ্বলে সেও ঢলে পড়তে চায় পশ্চিম আকাশের কোল জুড়ে ; আর এ মন শুধু কোল কিংবা বালিশ খোঁজে, দুটোর একটি হলেই হয় - কিন্তু এখনো যে ঢের সময় বাকি, বিকেলবেলাটার আগমন যে এখনো হয়নি!

সন্ধ্যা নামার মুখে শুধু এক ঘরের দেখা পাওয়ার বাকি, কারন সেখানে পৌঁছোলেই যেন সুখের ঢল নামবে, একটি চাতক পাখির মন প্রতীক্ষায় তার প্রেয়সীর মুখের ছবিখানা দেখার জন্য, মা যে বসে আছে খাবার নিয়ে টেবিলের এক কোনে বসে ; ছোট ফুটফুটে বাচ্চাটি চকলেটের অপেক্ষায় এখনো পড়তে বসে নি, বোনটির জন্য দুয়োরাণী সুয়োরাণীর বইখানা কিংবা ঠাকুরমার ঝুলি বইটি ঝোলায় পুরে পথচলা - এসব দৃশ্য যতদিন চোখের সামনে ভেসে ওঠে, ততদিন পথের ক্লান্তি, বাইরের করুনদৃষ্টি কিংবা বেজায় রোদ, ঝড়বৃষ্টির হুমকি - সে তো যেন পালকের উৎপাত, অনুভবই হয় না।

বাড়ি ফিরে সুবোধ বউটির হাসিমাখা মুখখানা, ব্যাগটা টেনে ঘরে নিয়ে যাওয়া - মার সে কন্ঠধ্বনি, বউমা,খোকা এসেছে কি? দেখোতো, কলিং বেল কে বাজাচ্ছে। যেই না বেলটার বেজে ওঠা তেমনি গুড্ডুবুড়া লাফিয়ে চলে এসে কাঁধ জড়িয়ে ধরবে, আমার সে প্রিয় সাফারি চকলেট,ক্যাডবেরি মিল্ক ফ্লেভার কোথায়? আর হাতের পিঠে রঙিন সে চকলেটের খোসা ছোঁয়া মাত্রই তার বাংলার পাঁচের মতো মুখটা ফুলে ডাবের মতো হয়ে ওঠা, খুশিতে গদগদ হয়ে কোঠার রূমে আন্টির কাছে চলে যাওয়া - এ জিনিসটা সবার জীবনে জুটে কি?

পৃথিবীতে এমন অনেক মানুষ দেখেছি, যারা কেবল সুখের সন্ধানে হা -হুতাশ করে, আরে, ওরে! এ জীবনে কি পেলাম।
কখনো তো একটি নতুন বাড়ি করা হয়নি, নিজের জন্য শখের সে জিনিসটি কিনতে পারি নি, একটি ভালো বউ পাই নি, সারাদিন আমার ভুল ধরে, এটা কেন করলাম না ওই অনুষ্ঠানে গেলে না কেন, তোমার কি দূরে কোথাও বেড়াতে মন চায় না নাকি? প্রশ্নের তীরে বিদ্ধ আমি, এ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি কোথায়?

Source

আমার মনে হয়, কি আসলো আর কি গেলো এসব ভাবতে ভাবতে হাতের সুখকে তারা সৎকার করে আসে। দুঃখ কিছুটা না পেলে তো, সুখের কি মূল্য বুঝলে? সারা দিন মনের ভিতরে আফসোস পুষে রাখো, বউটি আমার ত্রুটিগুলোকে নিয়ে বাক্যব্যায় করে ; কখনো এটি ভেবে দেখা হয়নি কেন সে শুধু নিজের জন্য কিছু চায় নি, সে ভালোবাসে বড় বেশি তাই আমাকে নিয়েই পড়ে রয়। সম্পর্কের কিছু দিকে শুধু স্বার্থ খুঁজলে হয় না, কারন তাতে ভাটা পড়ে সংসারে, জীবনে তার স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি গড়ে ওঠে।

প্রতিদিনই যদি কাছের মানুষগুলোকে নিজের কিছু স্বার্থ ত্যাগ করে সময় দেয়া যায়, অল্প কিছুটা সময়, প্রোডাক্টিভ, প্রফিটের হিসাব নিকাশ চুলোয় ছুড়ে দিয়ে ; তাদের সাথে একাকী,কিংবা নিভৃতে ছুটির দিনের মতো,মিষ্টি হাসির সমস্ত মিষ্টতা দিয়ে, সবটুকু আদর মিশিয়ে কথা বলা, ভালো আছো নয়তো কিভাবে তোমাদের ভালো রাখি বলো? এ জিনিসটি খুব দামি, বিশ্বাস করবেন কিনা জানিনা - তবে খুব সুখপ্রদ একটি দিক যার বেশ অনেকটাই আমরা জানিনা, নয়তো জেনেও করি না।

কোন কোন ধনাঢ্য লোকের কাছে টাকা-পয়সা আর কৃত্রিম গাড়ি বাড়িই সব, নিজ ছেলেমেয়ে পরিবারকে এসবে ডুবিয়ে রাখে। সপ্তাহের একটি দিনও নেই দেয়ার জন্য, একান্তে, মনভরে হৃদয়ের কথা বলার জন্য, এতটাই ব্যস্ত যে কোন কোন দিন খোঁজ নেয়া হয় না, খেয়েছ কি দুপুরে, নয়তো আমাকে কি মনে পড়ে? এভাবেই সাহেবের অর্থকড়ি বিরাট জীবনটি হেরে যায়, ভাঙনের মুখে মন যখন বিতৃষ্ণায় ডুবে যায় তখন উচ্চারিত হয় - তোমার টাকাই ছিল, মন অন্যখানে।
সুখ খোঁজা সে জায়গায় নিরর্থক।



0
0
0.000
5 comments
avatar

সবটুকু আদর মিশিয়ে কথা বলা, ভালো আছো নয়তো কিভাবে তোমাদের ভালো রাখি বলো?

আসলেই তাই, তাদের কিন্তু ভালো রাখার জন্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনেক কিছুই যথেষ্ট যা সচরাচর আমরা ধারণাও করতে পারি না, বড় জিনিষগুলোর পিছনে ধাওয়া করতে গিয়ে ক্ষুদ্র বিষয়গুলোর বিশালাকার প্রাপ্তিগুলো হারিয়ে ফেলছি।

0
0
0.000
avatar
(Edited)

বড় জিনিষগুলোর পিছনে ধাওয়া করতে গিয়ে ক্ষুদ্র বিষয়গুলোর বিশালাকার প্রাপ্তিগুলো হারিয়ে ফেলছি।

এ বিষয়টা এখনকার অনেক মানুষের জীবনের একটি সত্য, ছোট জিনিসের মাহাত্ম্য হারিয়ে ফেলে অনেকেই।
তাই, অনেক কিছু জীবন থেকে হারিয়ে ফেলে অগোচরে।

ধন্যবাদ,💙👍

0
0
0.000
avatar

আসলেই,সুখী হতে গেলে শুধু একটা জিনিসই করা লাগে,আর তা হলো জীবন থেকে চাওয়া আর পাওয়ার হিসাবটাকে চিরতরে বাদ দিয়ে দেওয়া।

0
0
0.000
avatar

চাওয়া পাওয়ার হিসাব থাকবেই - এটাকে আমলে না নিয়ে নিজের বর্তমান জীবনটাকে যারা স্বল্প কিছুর মধ্য দিয়ে উপভোগ করতে পারে, নিজ ও তার পরিবারকে আনন্দ দিতে পারে, ছোটবড় উপহার কিংবা নিজের ব্যক্তিগত কিছু সময় তাদের জন্য বরাদ্দ দিতে, ব্যস্সতাকে বৃদ্ধাঙ্গলি দেখেয়ি - তাহলেই পারিবারিক জীবনে সুখের আশা করা যাবে।

ধন্যবাদ আপনাকে, 👍

0
0
0.000