অদৃশ্য মায়া

avatar

ক্ষণিকের এই নশ্বর পৃথিবীতে এক অদ্ভুত বস্তু আমাদের সকলেই ইন্দ্রজালের ন্যায় আচ্ছাদিত করে রেখেছে। যত আমরা এ জাল ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করি, কোনো না কোনোভাবেই আবার সেই অদৃশ্য জালের মধ্যে আঁটকে যাই। এ পৃথিবী হয়তো একদিন শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু এ ধরণিতে যতদিন প্রাণের স্পন্দন রইবে, অজান্তেই অদৃশ্য মায়া থেকে যাবে। তপু ছোটবেলা থেকেই নতুন কোনো বস্তুর সম্মুখীন হতে ভীষণ ভয় পেত। ভয় পেত পরিবর্তন দেখে, সংকোচ কাজ করত অজানাকে জানতে বা অপরিচিত কারোও সাথে পরিচিত হতে।

photo-1602974605125-2b4afee39ab5.jpeg
© Michael Dziedzic

ছোটকাল থেকেই তার জীবনের বেশির ভাগ সময় কেটেছে নিজের ছোট চার দেয়ালের মাঝে থেকেই। তার বাবা-মা দুজনই পেশায় চিকিৎসক হওয়ার দরুন তাকে কখনোই তেমন একটা সময় দিতে পারতেন না। তাই সে বেশিরভাগ সময়েই নিজের মধ্যে নিজেকে খোঁজার চেষ্টা করত, নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকায় অভ্যস্ত হয়ে পরে। আর দিনকে দিন নিজের অজান্তেই সে বাইরের পরিবেশের সাথে মিশতে অপারগ হয়ে পরে। তার ছোট মামা গ্রাম থেকে শহরে যখন প্রথম বারের মতো তাদের বাসায় আসে, সে যেন ঘরের চার দেয়ালের মাঝে চাতক পাখির ন্যায় কাতরাতে থাকল।

এজন্য নয় যে তার মামার আগমনে যে বড্ড খুশি হয়েছে। তার মা, তার ছোটভাইয়ের আগমনে যখন বেশ খুঁশি, এদিকে আদরের একমাত্র সন্তান তপুকে খুঁজে না পেয়ে অনেকটা বিচলিত হয়ে পরলেন। তার মা ভাবতে লাগল এইতো কিছুক্ষণ আগে তার পছন্দের বলটা নিয়ে বারিন্দায় খেলতেছিল, হঠাৎ কেন জানি অদৃশ্য হয়ে গেল। এই অল্প সময়ের মধ্যে ত বাইরেও যাওয়ার কথা না মেইন গেইটে ভেতর থেকে তালা ঝুলছে। তার রুমে গিয়ে হানা দিতেই দেখে, সে তার কক্ষের এক কোনায় কাঠের আলমারির পাশে নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে।

কাছে যেতেই দেখলো, তপু ভয়ে কাঁপছে। এই প্রথম তার মা ছেলেকে কখনো এতোটা ভয় পেতে দেখলেন। তিনি বুঝতে পেলেন তপুর সমস্যা, অপরিচিত কারো সাথে পরিচিত হতে তার ভীষণ সংকোচ কাজ করে। তার মা ছেলেকে সেখান থেকে তোলে, তাকে জড়িয়ে ধরে, তার ছোট মামার পাশে গিয়ে বসলো। তার ছোট মামা ভীষণ সুকৌশলী একজন লোক ছিলেন, ছোটদের আসর জমাতে তার জুড়ি মিলা ভাড়। অবশেষে হরেক রকমের চকলেট এবং তার প্রিয় জিনিসপত্র একের পর এক কিনে দিয়ে, তার সাথে বিকেলে ক্রিকেট খেলার সঙ্গী হয়ে এবং বাইরে ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার দরুন ধীরে ধীরে তার অজান্তেই মনে জায়গায় করে নেন।

তপু তার মামার পাশে থাকা অবস্থায় কখনো টের পায়নি যে সে কতটা তার আপন হয়ে যাচ্ছে দিনকে দিন। তিনদিন তার সাথে কাটানোর পর যখন তার মামা চলে যায়, সে ভীষণ শূন্যতা অনুভব করতে লাগল এবং তার মাকে জড়িয়ে ধরে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগল। এই বুঝি সে অদৃশ্য জাল, এ বুঝি সে অদৃশ্য মায়া। অপরিচিত কারো সাথে দীর্ঘ সময় ধরে চলা কিংবা অতি অল্প সময় অতিবাহিত করে কারো মানে অজান্তেই জায়গা করে নেয়ার নামই বোধহয় মায়া। তাই নয় কি?

এ মায়া যে মানুষের সাথে মানুষের ঘটে তাই নয়, মায়া হতে পারে পশু পাখির সাথে, মায়া হতে পারে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার্য কোনো একটা বস্তুর সাথে, যদিও বা সেটির মধ্যে কোনো প্রাণ বা অনুভুতি নেই। মায়া হতে পারে, রাস্তা দাঁড়িয়ে থাকা এক মুমূর্ষ এক কুকুরের দিকে চেয়েও, ধরেন আপনি সে কুকুরকে পাশের দোকান থেকে একটি রুটি কিনে খেতে দিলেন আর দিনে শেষে বাড়ি ফেরার পথে সে কুকুরটি আপনার আতিথিয়েতা পূরণের জন্য আপনার অজান্তেই আপনার আপনার বাড়ির পিছু পিছু এলো- কারন সে পশুর মনেও আপনার প্রতি মায়ার সৃষ্টি হয়েছে।

তপু বড় হয়ে যখন গ্রামে যায়, তখন গ্রামের প্রকৃতি তাকে ভীষণ টানে, শহরে থাকলে গ্রামে যাওয়ার জন্য তার মধ্যে এক অদ্ভুত তাড়নার সৃষ্টি করে। সেবার এক ভরদুপুরে সে একা একাই বেড়িয়ে পড়ে প্রকৃতির উদ্দেশ্য, গ্রামের বেশির ভাগ জিনিসই তার কাছে অচেনা; এমনকি জমিতে ফলানো কিছু ফসলও তার কাছে একদমই নতুন লাগে। হঠাৎ গ্রামে কাঁচা পথ ধরে হাটতে হাটতে সামনে দেখতে পায় আধা কাচাপাকা দাঁড়িওয়ালা একজন লোক জমিতে কাচি দিয়ে ঘাস কাটছে। সে গিয়ে কিছু জিজ্ঞাস করবে যে এমন সাহস তার আর হচ্ছিল না, কারন ছোট থেকে স্বভাব সে অপরিচিত কারো সাথে সহজে মিশতে পারে না, তাই সে নিশ্চুপ থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লোকটির ঘাস কাটা দেখতে লাগল।

আর লোকটি তাকে দেখে এগ্রামে অপরিচিত মনে হওয়ায় নিজ থেকে প্রশ্ন করা শুরু করে দিলো। আর একে একে কাজের ফাঁকে ফাঁকে লোকটির প্রশ্নের জবাব সে দিতে থাকে। গ্রামের সহজ-সরল সে লোকটির সাথে কথা বলে, লোকটিকে ভীষণ ভালো লেগে যায় তার। আর এই বুঝি সে অদৃশ্য বস্তু, যা এ ধরণিতে বেশি সময় থাকার আমাদের মধ্যে তারনার সৃষ্টি করে, তাই নয় কি?



0
0
0.000
5 comments
avatar

ভাই গল্পটা অসাধারণ ছিল

তপু চরিত্রটা খুব বেশি অচেনা নয়। কারণ নতুন নতুন সবার মধ্যেই এই ভয়টা কাজ করে। অদৃশ্য মায়া কখন যে তৈরি হয় বোঝা বেশ কঠিন। যত সহজে এই মায়া আমাদের মধ্যে তৈরি হয়, তত সহজেই কিন্তু আমরা এই মায়াকে ত্যাগ করতে পারি না।

0
0
0.000
avatar

ধন্যবাদ আপু আপনার মতামতের জন্য।

0
0
0.000
avatar

মায়া জিনিসটা খুব বড় মাপের একটি আবেগ, যেটা একদিকে পৃথিবীতে জীবের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার একটি অন্যতম কারন বলে আমি মনে করি। ধরুন, যদি নবজাতক শিশুর প্রতি মায়ের স্বভাবসুলভ মায়া না জন্মাতো, তাহলে হয়তো একটি জাতি বিপন্ন হওয়ার সম্মুখীন হতো।
আর, গ্রাম ও শহরের জীবন খুব আলাদা, যারা জীবনের তাগিদ, প্রয়োজন বা বৈষয়িক সুখের খোঁজ করে,তারা শহরে যান্ত্রিক জীবনকে বরন করে,যাদের মনের মুক্তি দরকার, তারা গ্রামকে কখনো ভুলতে পারে না, তাদের কিছুদিন পর নিজ গ্রামটা দেখা চাই ই চাই।

বাস্তবভিত্তিক একটি লেখা, 👌

0
0
0.000
avatar

জ্বি, একদম তাই। মায়াই দুনিয়ার আসল অস্তিত্বের ধারক। ধন্যবাদ ভাই আপনাকে সময়ে নিয়ে যুক্তিমূলক মতামতের জন্য।🤍

0
0
0.000